১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন, আইয়ুব খানের স্বৈরশাসন-বিরোধী আন্দোলন, ’৬২ ও ’৬৪-এর শিক্ষা আন্দোলন, ‘৬৬-এর ঐতিহাসিক ৬-দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান অসহযোগ আন্দোলন, সর্বোপরি বাঙালির স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকারের দাবির আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ছিল মূল চালিকাশক্তি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পাকিস্তানের শোষণের অবসান এবং বাঙালির স্বাধিকার ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার দাবিতে সৃষ্টি হয় অভূতপূর্ব জাতীয় জাগরণ। ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যার পর ২৬ শে মার্চের প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্ররূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু বাঙালি জাতির স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্যই আজীবন সংগ্রাম করেননি, তিনি বাঙালি নারীদের কীভাবে বৈষম্যহীন মর্যাদাপূর্ণ পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অবকাঠামোতে সংযুক্ত করা যায়, সেই ব্যাপারেও সজাগ ছিলেন। ১৯৬৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু নারীদের মূলধারার রাজনীতিতে সরাসরি অংশগ্রহণ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্র ও গণজীবনের সব পর্যায়ে নারীদের সম অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয় এবং নারী ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে রাষ্ট্রের বিশেষ বিধান প্রণয়ণের ক্ষমতা সংযোজন করা হয় ও স্বাধীনতার পর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার দেশ পুনর্গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ের পর সামরিক শাসকরা মৌলিক অধিকার হরণ করেছিল ও ধ্বংস করেছিল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো। ক্রমান্বয়ে স্বাধীনতা-বিরোধী, যুদ্ধাপরাধী ও সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলোকে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে পুনর্বাসিত করা হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ অতীতের মতোই চরম নির্যাতন-নিপীড়ন উপেক্ষা করে সামরিক-স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে অকুতোভয় সংগ্রাম গড়ে তোলে। ১৯৮১ সালের ১৭ মে বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর স্বৈরাচার বিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামে উন্মোচিত হয় নতুন অধ্যায়ের। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাঙালি জাতির হারানো গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের এক নবতর সংগ্রামের পথে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া দলটি ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। পুনরায় জনতার রায়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করে।
২০১৪ সালের নির্বাচনের পর দলটি টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসে। সর্বশেষ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রেকর্ড টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর একাগ্রতা, বিচক্ষণতা ও লক্ষ্যে পৌঁছার স্থির সংকল্প নিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছে। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানসহ মানুষের জীবন ধারণের মৌলিক সমস্যার সমাধান এবং কর্মের অধিকার এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্যে আওয়ামী লীগ সরকার নানাবিধ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে চলছে ও ইতোমধ্যে দারিদ্র্যমোচনসহ সামাজিক খাতে বাংলাদেশের অসাধারণ অগ্রগতি সারাবিশ্বে বিপুলভাবে নন্দিত হয়েছে। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন এমডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বিশেষ সাফল্য অর্জনের জন্য বাংলাদেশকে উন্নয়নের মডেল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। দেশরতœ শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে ও সুদক্ষ রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশাসন, স্থিতিশীল অর্থনীতি, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, উন্নয়নে গতিশীলতা, ডিজিটাল বাংলাদেশ, শিক্ষার প্রসার, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, কর্মসংস্থান, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, খাদ্য নিরাপত্তা, নারীর ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা বিরোধী, জঙ্গি ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগ, আওয়ামী লীগের সকল সংগ্রাম এবং পরিকল্পনার অন্যতম সাথীও জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলছে এই সংগঠন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ অনুসরণ করেই বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সকল পর্যায়ে লিঙ্গ সমতা, নারীর উন্নয়ন এবং ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার জন্য অসংখ্য নীতিমালা ও আইন প্রণয়ন করেন এবং বাস্তবিক অর্থে সব পর্যায়ে তা সুসংহত ও কার্যকর করার জন্য নিরলসভাবে কাজ করছেন। শিক্ষায় নারীদের শতভাগ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা, নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করা, আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নারীদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করা এবং রাজনীতিতে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করার জন্য শেখ হাসিনার গৃহীত উদ্যোগ ও সাফল্য অভাবনীয়। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, সেনা, নৌ, পুলিশ, বিজিবি, সাহিত্য, শিল্পসহ সর্বোচ্চ বিচারিক কাজেও নারীদের অংশগ্রহণ ও সাফল্য এখন লক্ষণীয়। বিশ্বে প্রশংসিত প্রথম নারী উপাচার্য, প্রথম নারী পর্বতারোহী, প্রথম বিজিএমইএ নারী সভাপতি, প্রথম সংখ্যালঘু নারী মেজর, প্রথম নারী স্পিকার, প্রথম নারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিগত এক দশকেই সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের নারীরা খেলাধুলায়ও পিছিয়ে নেই।
রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণকে সুসংহত করার জন্য জাতীয় সংসদে নারী আসনের সংখ্যা আরও বিশটি বাড়িয়ে ৫০টিতে উন্নীত করা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে অনেক নারীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নারীর অংশগ্রহণের বিষয় বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে নবম। আবার ১৪৬টি দেশের মধ্যে লিঙ্গ বৈষম্য নিরসনে বাংলাদেশের অবস্থান ৭১তম। (গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২২, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম)। নারীদের এই অভূতপূর্ব ক্ষমতায়নে অংশগ্রহণের সুযোগ ও অনুপ্রেরণার যিনি স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরতœ জননেত্রী, তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়াও অভিভাবকত্বে পিতার পাশাপাশি মাতার নাম সংযুক্ত করে নারীর মর্যাদাকে সমুন্নত করা হয়েছে। উন্নয়ন গণতন্ত্র শান্তি ও সমতা প্রতিষ্ঠায় জননেত্রী শেখ হাসিনার সম্মোহনী নেতৃত্ব বিশ্বজনীন স্বীকৃত। বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগ জননেত্রী শেখ হাসিনার দেখানো পথে চলছে এবং বাঙালি নারীদের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে অনুপ্রেরণা দেবার লক্ষ্যে অবিচল ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে সকল গণআন্দোলন, সংগ্রাম ও দেশ গঠনে আমাদের নারীদের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। নারীরা তাদের মেধা, শ্রম, সাহসিকতা, শিক্ষা ও নেতৃত্ব দিয়ে আমাদের দেশ গঠনে কাজ করে যাচ্ছেন এবং একই সঙ্গে ভূমিকা রাখছেন একটি স্বাবলম্বী শিক্ষিত প্রজন্ম গঠনে। নানা অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে যে অভাবনীয় আর্থিক সমৃদ্ধি, উন্নয়ন ও প্রবৃব্ধি অর্জন সম্ভব হয়েছে, তা মূলত নারীর ক্ষমতায়ন ও অগ্রগতির জন্যই, আর এক্ষেত্রে যার অবদান অনস্বীকার্য, তিনি রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্ব বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের পাথেয়। নারী-পুরুষের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে ন্যায়ানুগ আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগ নিরলসভাবে কাজ করে চলছে। সমাজ বিবর্তনের যুগসন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ থেকে সকল প্রকার বৈষম্য, অনাচার, অত্যাচার এবং নারী নির্যাতনকে নির্মূল করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুষ্ঠ সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে গৃহীত চার মূলনীতি বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার উপর ভিত্তি করে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার জন্য তারই কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করাই বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের অঙ্গীকার।